গল্প

 জীবন জীবনের নিয়মে চলে যায়....

- আকাশ আহমেদ


আমি এক মেয়েকে চিনতাম যে কলেজ লাইফে আরাম আয়েশ, মৌজ মস্তিতে জীবন না কাটিয়ে বিয়ের জন্য টাকা জমাতো। মেয়েটা ছিলো আমার ক্লাসমেট। আমরা একসাথে আবৃত্তি করতাম। বেশ মিশুক প্রকৃতির মেয়ে। শিলিগুড়ি কলেজে ক্যামেস্ট্রি নিয়ে পড়া এই মেয়েটা রোজ সকালে উঠে এয়ারভিউ মোড় থেকে হাকিমপাড়া পর্যন্ত হেটে যেত দশ টাকা বাঁচানোর জন্য। অথচ কেউ জিজ্ঞেস করলে হাসিমুখে বলতো, মুটিয়ে যাচ্ছিতো তাই হেটে যাই। কিন্তু আমি জানি সে অনাহারে থেকেও টাকা জমিয়ে যাচ্ছে বিয়ের জন্য।


মেয়েটার নাম ছিলো জয়া...

নামের মতো বিজয়িনী শান্ত শিষ্ট এই মেয়েটি প্রেম করতো শিলিগুড়ি কলেজের এক ছেলের সাথে। জয়া'র মুখেই শুনেছি ছেলেটা ওর পাশের পাড়ায় থাকতো। জয়া'র সাথে যাওয়ার জন্য রোজ বসে থাকতো কলেজ ছুটির সময়। জয়া'র ফ্যামিলির আর্থিক অবস্থা মোটামুটি। প্রতিমাসে ওকে একটা খরচ পাঠায়, ও নিজেও টিউশনি করিয়ে ভালো টাকা রোজগার করতো তবুও দিনাতিপাত করতো চাপিয়ে চাপিয়ে। সপ্তাহে একদিন মাংস কিনে সেটা রান্না করে সিংহভাগই নিয়ে যেত এই প্রেমিক পুরুষ টির জন্য। কখনো কখনো নিজের জন্য এক টুকরোও রাখতো না। আবার আফসোস করে বলতো, "বুঝলি তোর দাদা মেসের রান্না করা মাছ মাংস খায় না। একটু শুচিবায়ু আছে তো তাই। সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করে থাকে আমার হাতে খাবে বলে। 


জয়া'র প্রেমিক ছেলেটি সরকারি চাকরি'র এর জন্য দিন রাত এক করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। আর জয়া দিনরাত এক করে টাকা জমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। সারাদিন ক্লাস, টিউশন, কোচিং এর পর রাতে গিয়ে খাতা লিখতো কিছু টাকা পাবার আশায়। 


একবার জয়া অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় আর আবৃত্তি ক্লাসে না আসায় আমি খুব বকেছিলাম। তখন ও লাজুক গলায় বলল, " আমার খুব শখ বিয়ে অনেক ধুমধাম, আয়োজন করে করবো। যেন সবাই বলে, দেখ ওই জয়া'র বিয়ে হচ্ছে। এরকম বিয়ে আজকাল দেখা যায় না। 


জয়া'র এই পাগলামি কে কলেজের সবাই উড়িয়ে দিতো। কিন্তু আমার কাছে ভীষণ ভালো লাগতো। মেয়েটা নিজের শখ, ইচ্ছে পূরনের জন্য কারও উপর নির্ভর করে থাকছে না। নিজেই চেষ্টা করছে। আমার খুব ভালো লাগতো ওকে দেখে। আর মনে মনে ভাবতে থাকতাম ইস জয়া'র মতো কেউ যদি আমাকে ভালবাসতো...


আড়ম্বরহীন ভাবে একদিন জয়া'র বিয়ে হয়ে গেল। এক সকালে এসে আমার ঘুম ভাঙিয়ে বলল, "আজ আমরা বিয়ে করছি"।


আমি চোখ কচলে জয়া'র দিকে তাকাই। শান্ত, স্নিগ্ধ চোখ মুখে হাসি আনন্দ ঝলমল করছে। ছোটবেলায় ঈদের অথবা পূজা'য় নতুন জামা প্রথম দেখলে যেমন আনন্দ হয় তেমন আনন্দ সেদিন আমি জয়া'র চোখে দেখেছিলাম। 


জয়া'র বিয়েতে আমিও ছিলাম। ছেলেটা হঠাৎ ছোট একটা চাকরি পেয়ে গেল তাই আর দেরী করতে চাইলো না। কোনোরকম আয়োজন ছাড়াই সিদুর পড়ে বিয়ে করে নিলো। 


জয়া'র স্বামীকে দেখে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কালো বে/টে,মো/টা একটা ছেলের জন্য জয়া এতো পাগল ছিলো!  আমি আড়ালে নিয়ে জয়া'কে বললাম, "মরার প্রেম তোকে একদম অন্ধ করে দিয়েছে"?


জয়া আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, আকাশ এরকম প্রেম তোর জীবনেও আসুক। তখন বুঝবি। আমি বুঝেছিলাম, এ প্রেম জয়া'কে অনেক টা স্রোতের মতো ভাসিয়ে নিয়েছিল বলেই তার ধুমধাম করে বিয়ে করার শখ টাও কর্পুরের মতো উবে গেছে। 


জীবন জীবনের নিয়মে চলে যায়।


জীবন যুদ্ধের যাতাকলে পিসতে পিসতে আর অস্তিত্বের লড়াইয়ে আমিও জয়া'কে ভুলেই গিয়েছিলাম। হটাৎ সেরকম ই একদিন জয়া'র সাথে আমার দেখা হলো। ভুটান থেকে বিজনেস কাজ শেষে বাসে করে শিলিগুড়ি ফিরছিলাম তখনই পরিচিত কন্ঠস্বর ডেকে উঠলো, আকাশ না ?


আমি জয়া'কে দেখে আঁতকে ওঠা গলায় বললাম, জয়া তুই ? এই অবস্থা কেন ! 


আবারও মলিন মুখে হেসে বললাম , তোর এই অবস্থা কেন ? কবিতার আসরে ঝড় তোলা আর রোজ রাতে ফেসপ্যাক ঘসে মুখের চামড়া মসৃন করা মেয়েটার মুখ এতো বুড়িয়ে গেল !


জয়া মৃদু হেসে বললো, তোর বলা মতো কঠিন প্রেম ঠিকই এসেছিল কিন্তু সেটা সহ্য হয়নি তো তাই....


জয়া উদাস গলায় আরও বলল, মেয়েরা যখন প্রেমে পড়ে, ভালোবাসে তখন তাদের কাছে জীবন টা কে রুপকথার গল্পের মতো মনে হয়। কিন্তু রুপকথা বলে মেয়েদের জীবনে কিছু হয় না। যা হয় সেটা হলো অরুপকথা। 


জয়া নেমে যাওয়ার সময়ে আমি ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, তোর কথা তো বললি না ? তোর স্বামী ? বাচ্চাকাচ্চা ?


জয়া গলা খাদে নামিয়ে বলল, তুই কলেজ ছাড়ার পর পর'ই আমি ফিরে এসেছিলাম। খালি হাতে এসেছিলাম জানিস ! অথচ সংসারের সব জিনিস আমার জমানো টাকায় কেনা ছিলো তবুও ফেরার সময় কপালে একটা কাপড়ের টিপপ পর্যন্ত পরে আসতে পারিনি। ভালো প্রেমিক যে হয় সে কোনোদিন ভালো স্বামী হয় না। 


জয়া বাস থেকে নেমে গিয়ে ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। আমার কানে তখনও জয়া'র বলা কথা বাজতে থাকে। "মেয়েদের জীবনে কোনো রুপকথার গল্প হয় না। যা হয় তা হলো অরুপকথার গল্প" ...!!

Comments